
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
ঢাকার মিরপুরে একটি নারী সমবায় সমিতির সেমিনারে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে স্থানীয় উগ্রপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরা। গতকাল ১৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুর এলাকায় অবস্থিত ‘আশার আলো মহিলা বহুমুখী সমবায় সমিতি’র অস্থায়ী কার্যালয়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় সংগঠনটির অন্তত ১০-১২ জন কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, শনিবার সংগঠনটির একটি অভ্যন্তরীণ সেমিনার চলাকালীন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (JUIB)-এর মিরপুর এলাকার নেতা মুফতি মকবুল হোসাইন কাসেমী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (BJI)-এর স্থানীয় নেতা রেজাউল করিমের নেতৃত্বে একদল কর্মী লাঠিসোঁটা, ক্রিকেট স্ট্যাম্প ও লোহার পাত নিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করে। তারা সেমিনারে উপস্থিত নারীদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।
হামলাকারীরা চিৎকার করে বলতে থাকে, “দেশে কোনো ইসলাম বিরোধী কাজ বা লেসবিয়ানদের কর্মসূচি চলতে দেওয়া হবে না।” এই বলে তারা উপস্থিত কর্মীদের বেধড়ক মারধর করে সেমিনার পণ্ড করে দেয়। যাওয়ার সময় তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম চালালে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার হুমকি দিয়ে যায়।
আহত কর্মীরা জানান, হামলায় সংগঠনটির বেশ কয়েকজন নারীর হাত, পা ও পিঠে গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং মাংসপেশি থেঁতলে রক্তক্ষরণ হয়েছে। ঘটনার পরপরই আহত ১০-১২ জনকে নিকটস্থ “মিরপুর হলি ক্রিসেন্ট হসপিটাল”-এ নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে তারা চিকিৎসকের পরামর্শে নিজ নিজ বাসায় বিশ্রামে রয়েছেন।
দীর্ঘদিনের হুমকি ও আতঙ্ক
সংগঠনের কর্মীরা অভিযোগ করেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইকবাল হোসেন এবং মুফতি মকবুল হোসাইন কাসেমী দলবলসহ সমিতির একটি সভায় এসে বাধা প্রদান করেন। সে সময় তারা সভানেত্রী আসমা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “নারীদের নিয়ে তোমরা ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করতে সংঘবদ্ধ হয়েছ, এসব বন্ধ না করলে কঠিন মূল্য দিতে হবে।” এরপর কর্মীদের ধাক্কা দিয়ে সভাস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০ জানুয়ারি মুফতি মকবুল হোসাইন কাসেমী সংগঠনের এক কর্মীকে ফোনে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেন। ফোনে অভিযোগ করা হয় যে, সংগঠনটি নারীদের পর্দার বিরুদ্ধে, অবাধ মেলামেশা এবং সমকামিতার (লেসবিয়ানিজম) পক্ষে কাজ করছে।
সুরক্ষার অভাবে আত্মগোপনে কর্মীরা
এত বড় ঘটনার পরও সমিতির পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংগঠনের সভানেত্রী আসমা বেগম জানান, এর আগেও উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি; উল্টো সন্ত্রাসীরা আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল।
সভানেত্রী আরও বলেন: “নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমরা পুলিশে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। কর্মীদের জীবন বাঁচাতে আপাতত সবাইকে আত্মগোপনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা পুনরায় সমিতির কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করব।”
এই হামলার পর থেকে মিরপুরের ওই এলাকায় সাধারণ নারী কর্মীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত স্থানীয় জামায়াত বা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতাদের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।